
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি
ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও বিক্ষোভ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ট্রাম্পের বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত বহন করে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরানে যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় বা তাদের সহিংসভাবে হত্যা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। তার এই মন্তব্য ইরানের সরকারের কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। বরং এটিকে দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছে ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়, বরং তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও বিপজ্জনক। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্দোলনে নামা বিক্ষোভকারীদের এমন বার্তা দিচ্ছেন, যেন যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে তাদের ‘উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের ‘আমরা প্রস্তুত, সবকিছু লোড করা আছে এবং যেতে প্রস্তুত’—এমন মন্তব্যকে তিনি সরাসরি সামরিক হুমকির ইঙ্গিত বলে মনে করছেন।
আরাগচি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং কোনো হামলা হলে কোথায় ও কীভাবে জবাব দিতে হবে, তা তারা ভালোভাবেই জানে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হবে।
এদিকে ইরানে সপ্তাহব্যাপী চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত আটজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে নিহতদের পরিচয় ও মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় রাজধানী তেহরানে। খোলাবাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের বড় ধরনের পতনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ব্যবসায়ী ও দোকানিরা। দ্রুত এই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য শহরে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দিলে বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স এবং মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাওয়ের তথ্যমতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লোরদেগানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। হেঙ্গাও দাবি করেছে, নিহত দুজনই বিক্ষোভকারী ছিলেন এবং তাদের নাম আহমাদ জলিল ও সাজ্জাদ ভালামানেশ। অন্যদিকে ফার্সের খবরে বলা হয়, পশ্চিমাঞ্চলের আজনা শহরে তিনজন এবং কুহদাশতে একজন নিহত হয়েছেন। তবে তারা বিক্ষোভকারী নাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া মধ্য ইরানের ফুলাদশাহর ও দক্ষিণের মার্ভদাশতেও নিহতের খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব মৃত্যুর ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ইরানি পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, বিক্ষোভ যেন বিশৃঙ্খলায় পরিণত না হয়, সে জন্য পুলিশ কাজ করছে। তিনি বলেন, জননিরাপত্তা ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষাই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় বা সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নীরব থাকবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, যার জবাবে কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ইরান সতর্ক করছে যে, নতুন করে কোনো সংঘাত পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ট্রাম্পেরই সবচেয়ে ভালো বোঝার কথা যে, জনসম্পত্তির ওপর অপরাধমূলক হামলা কোনো দেশই সহ্য করে না। তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশে যেভাবে কঠোর অবস্থান নেয়, ইরানও তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় একই অধিকার রাখে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের ‘যৌক্তিক দাবিগুলো’ শুনতে প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে দেশটির আইনজীবী জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি-আজাদ সতর্ক করে বলেন, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যেকোনো প্রচেষ্টার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি জাতিসংঘের মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে লেখা এক চিঠিতে ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের হুমকি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী।
চিঠিতে ইরাভানি উল্লেখ করেন, ইরান তার সার্বভৌম অধিকার রক্ষায় দৃঢ় ও প্রাসঙ্গিকভাবে পদক্ষেপ নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বেআইনি হুমকি এবং এর ফলে সৃষ্ট যেকোনো উত্তেজনার পূর্ণ দায় ওয়াশিংটনের ওপর বর্তাবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে নীতি পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, বর্তমান বিক্ষোভ তার তুলনায় ছোট পরিসরের হলেও তা সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এখন পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে।
সূত্র: বিবিসি