আজ | সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯
Search

সমস্যা যখন জরায়ুর মুখ বের হওয়া

ডা. কাজী ফয়েজা আক্তার | ৮:৩৩ অপরাহ্ন, ২ এপ্রিল, ২০১৯

chahida-news-1554215625.jpg
ডা. কাজী ফয়েজা আক্তার

লজ্জা, ভয় ও কুসংস্কারের কারণে আমাদের দেশের অনেক নারীরা তাদের শারীরিক অসুখের কথা গোপন রাখেন। তারা এসব অসুখের কথা কারো সাথে শেয়ার করেন না বা ডাক্তার দেখান না।

একটা পর্যায়ে গিয়ে রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যখন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আর রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়না। তেমনি একটি সমস্যা `প্রোলেপস`। বা নারীর জরায়ু মুখ বের হয়ে যাওয়া। দুটা বয়সে নারীর প্রোলেপস হয়। একটা হলো নারীর যখন মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বা মেনোপজ হয়ে যায় ঐ সময়টাতে প্রোলেপস হয়।

আরেকটা বয়স হলো, একটা বেবি আছে বা young age এমন বয়সটাতেও প্রোলেপস হয়। তবে একটা বাচ্চার মা বা অল্প বয়সী নারী জরায়ুর মুখ বের হয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে এসেছেন তা সাধারণত হয়না। এটা আনকমন সমস্যা।

এমন নারীদের এই সমস্যার জন্য সাধারণত তাদের প্রসবকালীন ত্রুটি দায়ী। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়, এমন দাঈ তাকে ( প্রসূতি) এমন সময় চাপ দিতে বলেছিল যখন তার জরায়ুর মুখ পুরোপুরি খোলেনি।

ফলে অপ্রস্তুত জরায়ুকে বেশী চাপ দেওয়ায় তার যে সাপোর্টগুলো ছিল তা লুজ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ডেলিভারীর পর তার জরায়ুটাই বের হয়ে আসে।

এধরনের মায়েদের আমরা অপারেশনের মাধ্যমে জরায়ুর মুখটা শর্ট করে জরায়ুটাকে আগের জায়গায় প্রতিস্থাপন করে দিই। আরেকটা কমন বিষয় হচ্ছে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বা মেনোপোজের পর জরায়ুর মুখ বের হয়ে যাওয়া।

এটা এমন একটা বয়স যখন নারীর স্বামী থাকেনা বা স্বামী মারা যায়। ফলে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ সময় নারীরা যৌন সম্পর্ক স্থাপন থেকেও দূরে থাকে। জরায়ুর মুখ বের হয়ে আসার সমস্যা নিয়ে অনেক নারী টানা আট দশ বছরও থাকে। তিনি কারো সাথেই এ সমস্যা আলাপ করেন না। এমনকী তিনি যে এটা নিয়ে শারীরীক সমস্যা বোধ করছেন তা কাউকে বলেন না।

আমাদের ( ডাক্তার) কাছে এমন সমস্যা নিয়ে যেসব রোগী আসেন তাদের এ সমস্যা কমপক্ষে আট দশ বছর আগের। তার বেশী সময়ের রোগীও আসে। আমাদের কাছে যখন সমস্যাগ্রস্থ নারী আসেন তারা বলেন, আমার মাসিকের রাস্তা দিয়ে কিছু একটা বের হয়ে যাচ্ছে বা নেমে যাচ্ছে। আমি যখন হাঁচি দিই, কাশি দিই তখন এটা বেশী বের হয়ে আসে। আবার যখন শুয়ে থাকি তখন এটা কিছুটা ঢুকে যায় কিন্তু বাইরে বের হয়ে থাকে। এটা আপনার ( আক্রান্ত নারী) কী ক্ষতি করে? এর প্রধান সমস্যা হলো ঐ নারী প্রসাব ও পায়খানা করতে গিয়ে জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয়। আক্রান্ত নারী প্রসাব বা পায়খানা করতে বসলে আগে বের হয়ে থাকা জরায়ুর মুখ ভেতরে পুশ করে ধরে রাখে তারপর প্রসাব বা পায়খানা করে। এবং প্রসাব পায়খানা কমপ্লিট হওয়া পর্যন্ত এটা হাত দিয়ে ধরে রাখে। হাত সরিয়ে ফেললেই আবার বের হয়ে আসে। তার মানে লাইফের কত প্যাথিটিক ও কষ্টকর বিষয় নিয়ে সে দশ পনের বছর পার করে। একটা পর্যায়ে ঐ নারী আমাদের কাছে আসতে বাধ্য হয়। কখন বাধ্য হয়? জরায়ুর মুখ বাইরে থাকতে থাকতে একটা পর্যায়ে গিয়ে সেখানে ঘা হয়। তখন সেখানে দুর্গন্ধ ছড়ায় ও সাদা স্রাব যেতেই থাকে। সাদা স্রাবের সাথে তখন লালচে লালচে একটা স্রাব যায়। নারী মনে করে, হয়তো নতুন করে আবার মাসিক শুরু হচ্ছে। এই সাদা ও লালচে স্রাবের ফলে নারীর নামাজের ব্যঘাত ঘটে। সে তখন নামাজ বা কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে না। তখন ঐ নারী বাধ্য হয়ে পরিবারে জানায়, আমার এরকম সমস্যা হচ্ছে। আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। তখন রোগী আমাদের কাছে আসে। জরায়ুর মুখ বের হয়ে আসার কিছু কারণ আছে। তার একটি আগে বলেছি। অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাঈ যদি ডেলিভারী করায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগে চাপ দেয় তাহলে জরায়ুর আশেপাশের গ্রন্থিগুলো ছিঁড়ে যায় এবং জরায়ু বের হয়ে আসে।

দ্বিতীয়ত, যেসব নারী বহু সন্তান প্রসব করে ( আট দশটা বাচ্চা, বারবার তারা গর্ভে সন্তান ধারণ করে ও প্রসব করে, প্রতিটা বাচ্চা নেওয়ার মাঝে সময়ের ব্যবধান খুব কম, দেখা যায় বাচ্চা দুটার বয়সের ব্যবধান এক বছরের কম। এমন নারীদের জরায়ু প্রসবের পর স্বাভাবিক হয়ে আগের অবস্থানে যাওয়ার আগে আবার গর্ভে সন্তান ধারন করে। ফলে জরায়ুর যে সাপোর্ট তা লুজ হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, কারো যদি হাঁপানীর সমস্যা থাকে বা অনেকদিন ধরে কাশীর সমস্যা থাকে- এমন নারীর পেটের মধ্যে সব সময় একটা চাপ থাকে। এবং এই চাপের কারণে জরায়ুর মুখ বের হয়ে আসে।

সর্বশেষ, কারণ হচ্ছে মেয়েদের মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া । একটা কমন হরমোন, যা শুধু নারীর শরীরে থাকে তা হচ্ছে `এস্ট্রোজেন`। এই হরমোন শরীরের সকল সাপোর্ট ঠিক রাখে। যখন মেনোপোজ হয়ে যায় তখন নারীর শরীরে এই হরমোন আর থাকেনা। যার ফলে এই সাপোর্ট আগের মতো স্ট্রং থাকেনা। ফলে জরায়ুর গ্রন্থিগুলো আস্তে আস্তে লুজ হয় ও বের হয়ে আসে।

আমরা সবাই মাকে ভালবাসি। সকল সন্তান তার মায়ের যত্নের ব্যাপারে সচেতন। সেদিক থেকে এটা এমন কোন সমস্যা না যা নিয়ে মাকে আট- দশ বছর কষ্ট করতে হবে। এটার একটা সহজ চিকিৎসা আছে। সেটা কী? তা হলো এই মাসিকের রাস্তা দিয়েই জরায়ুটা অপসারন করি। এতে পেটে বা অন্য কোথাও কোন কাটা ছেঁড়া করতে হয়না।

অপারেশনের পর খুব সহজে ও তাড়াতাড়ি ব্যথা কমে যায়। রোগী খুব তাড়াতাড়ি ও সহজে হাঁটাচলা করতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়, রোগীর প্রসাব ও পায়খানার সমস্যা তাড়াতাড়ি সমাধান হয়ে যায়।

তাই কারো যদি এমন হয়, জরায়ু মুখ একটু হলেও বের হয়ে আসছে তাহলে তিনি যেন অবহেলা না করে সাথে সাথে পরিবারের কারো সাথে শেয়ার করে ও ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

অল্প বয়সের নারী হলে আমরা জরায়ু ফেলিনা, শুধুমাত্র আগের জায়গায় প্রতিস্থাপন করি। আর যদি বয়স ৫০-৫৫ হয় তাহলে অপারেশন করার পরামর্শ দিই। আর যদি রোগীর বয়স ৭০ বা তার উর্দ্ধে হয় ও সঙ্গে অন্য অনেক অসুখ বিসুখ থাকে (নিয়ন্ত্রণহীণ ডায়াবেটিস, প্রেসার), বা এই বয়সে অপারেশন করার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না, তাহলে সেখানে রিং প্রতিস্থাপন করি যা দেখতে অনেকটা চুরির মত। এই রিং পরানোর ফলে জরায়ুকে আগের জায়গায় ধরে রাখে। ফলে নারী স্বাভাবিক ভাবে প্রসাব পায়খানা করতে পারে। জরায়ু মুখের ঘা হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। রিংটা কীভাবে পড়তে হয় তা আমরা শিখিয়ে দিই।

সাত-আট দিন পরপর পরিষ্কার করে ধুয়ে আবার নিজে নিজে পরা যায়। জরায়ু মুখের মাপ অনুযায়ী এটা কিনতে পাওয়া যায়। আগেই বলেছি, জরায়ু মুখ বের হয়ে গেলে ঠিকভাবে প্রস্রাব পায়খানা করা যায়না। ফলে সব সময় কিছু প্রস্রাব শরীরে জমা থেকে যায় যা কিডনিতে প্রভাব পড়ে। আমরা এমন রোগী দেখেছি প্রোলেপস এর জন্য কিডনি বিকল হয়েছে। তাই একে পুষে না রেখে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

(লেখক: ডা. কাজী ফয়েজা আক্তার, এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমসিপিএস। কনসালটেন্ট, ইমপালস হাসপাতাল। গাইনী, প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন।)

  

আপনার মন্তব্য লিখুন