আজ | বৃহঃস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯
Search

বন্ধুর জন্য মন কাঁদে : অরুণা বিশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২:৩৯ অপরাহ্ন, ১০ আগস্ট, ২০১৭

uploaded-file-1447238255.jpg
অরুণা বিশ্বাস ও দিতি


ভারতের চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট অব অর্থোপেডিকস অ্যান্ড ট্রমাটোলজি (এমআইওটি) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন মস্তিষ্কে টিউমার আক্রান্ত দর্শকপ্রিয় চিত্রনায়িকা পারভীন সুলতানা দিতি। দ্বিতীয়বারের মতো তার মাথায় অস্ত্রোপচার হয়েছে। দ্রæত আরোগ্য লাভের প্রার্থনা ও শুভ কামনা জানিয়ে দিতিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তারই প্রিয় বান্ধবী অরুণা বিশ্বাস। অনুলিখন : অভি মঈনুদ্দীন


গত জুলাইয়ে আমি কানাডায় ছিলাম। সেখানে বসেই জানতে পারি আমার প্রিয় বন্ধবী দিতির মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়েছে। এ খবরটি শুনেই আমি কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। চোখ বেয়ে অশ্রæ ঝরে পড়ে। খবরটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি আমার একমাত্র ছেলে শুদ্ধকে দেখতে কানাডায় গিয়েছিলাম। দিতি তাকে নিজের ছেলের মতোই আদর করে। তাই এ খবর শুনে শুদ্ধর মনটাও খারাপ হয়ে যায়। আমার মন চাইছিল তখনই আমি চেন্নাইয়ে চলে যাই। যা হোক, কিছু দিন পর আমি দেশে ফিরি। দিতিও কিছুটা সুস্থ হয়ে ২০ সেপ্টেম্বর দেশে আসে। দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই আমি দিতিকে দেখতে ছুটে যাই। ও জানাল, এখন ভালোই আছে। শুনে মন অনেকটা হালকা হয়ে যায়। ওইদিন দুই বন্ধু মিলে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। পুরনো দিনের অনেক কথা স্মৃতিচারণ করেছিলাম। প্রায় তিন দশক আমরা একসঙ্গে পার করেছি, তা মনেই হয়নি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, সম্পর্ক যখন মধুর থাকে তখন সময় কোন দিক দিয়ে বয়ে যায় তা আঁচ করা যায় না। দিতির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক এমনই যে, কখন চোখের সামনে দেখতে দেখতে এতটা বছর কেটে গেল, টেরই পেলাম না।
বিএফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১৯৮৩ সালে দিতি চলচ্চিত্রে আসে। আমি তার পরের বছরই চলচ্চিত্রাঙ্গনে পা রাখি। আমাদের বন্ধুত্বটা শুরু থেকেই মধুর ছিল। কখনই আমাদের সম্পর্কে চিড় ধরেনি। দিতি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একজন ভালো মানুষ এবং একজন দায়িত্বশীল মা। কিন্তু এমন একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়েও দিতিকে সারাটা জীবন কষ্টই করতে হয়েছে। আমার বান্ধবীটা এ জীবনে খুব বেশি সুখ পেল না। সে সারাটা জীবন সংগ্রাম করেই গেছে। জীবনের এ পর্যায়ে এসেও বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। অথচ এ বয়সে আমি, আমরা অনেকেই দিব্যি সুস্থ আছি। জানি না, এটা বিধাতার কোন খেলা।
দিতি খুবই পরোপকারী। আমি দেখেছি, সে দুই হাত ভরে মানুষকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। অথচ আমি এমন কিছু মানুষকে দেখেছি, যারা দিতিকে বার বার ঠকিয়েছে। আমি তাদের উদ্দেশে বলছি, বিধাতা যদি দিতিকে সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন, তবে তারা যেন দিতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। কারণ একজন ভালো মানুষকে কষ্ট দিতে নেই।
আমার কানাডার দিনগুলোর কথা আজ ভীষণ মনে পড়ছে। শুদ্ধ তখন ছোট। সে সময় দিতি কানাডায় গিয়েছিল। সেখানে বসে আমরা কত যে আড্ডা দিয়েছিলাম, তা বলে বোঝাতে পারব না। আবার কানাডা থেকে শুদ্ধকে নিয়ে যখন আমি ঢাকায় ফিরি, তখন বাসা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু দিতি ছায়ার মতো পাশে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে বলেছিল, ‘তুই আর শুদ্ধ আমার বাসায় থাকবি।’ এই যে আপন করে কাছে টেনে নেয়া, এটা দিতি ছাড়া আর কেউই পারেনি। আমার মা, ভাইসহ পুরো পরিবার দিতিকে নিজের পরিবারের সদস্য বলেই মনে করে। দিতির মেয়ে লামিয়া ও ছেলে দীপ্ত আজ বড় হয়েছে। মাকে দায়িত্ব নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে, এটা সত্যিই আনন্দের।
দিতির সঙ্গে খুব বেশি চলচ্চিত্রে আমি অভিনয় করিনি। তবে আমি এমন অনেক সহশিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করেছি যে, শুটিং করতে গিয়ে দেখেছি তাদের পলিটিক্সের কারণে আমার চরিত্রটির গুরুত্ব কমে গেছে। কিন্তু দিতির সঙ্গে যে কটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি, আমাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। দিতি কখনই ফিল্ম পলিটিক্স বুঝত না, করতও না। তাই ওর সঙ্গে কাজ করে ভালো লাগত। ‘হিংসার আগুন’, ‘অপরাজিত নায়ক’, ‘চার সতীনের ঘর’সহ আরো বেশ কটি চলচ্চিত্রে ওর সঙ্গে অভিনয় করেছি। শুধু তাই নয়; দিতির প্রযোজনা সংস্থা থেকে আমি নজরুলের বিশেষ দিবসের নাটকও নির্মাণ করেছি। আবার আমার নির্দেশনায়ও দিতি ‘সুরে আঁকা ছবি’তে কাজ করেছে। কিছু দিন আগেও আমরা একই ধারাবাহিকে ও খÐ নাটকে অভিনয় করেছি। তার মতো বন্ধু পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রর্থনা করছি, তিনি যেন দিতিকে দ্রæত সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন। আমার বিশ্বাস, দিতি আবারো তার সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। তার ফেরার অপেক্ষায় রইলাম।

  

আপনার মন্তব্য লিখুন