আজ | রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Search

সভ্যতার সংকট ও সমাধান

আবুল কাসেম ফজলুল হক | ১১:০৩ পূর্বাহ্ন, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

chahida-news-1505970235.jpg

বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে এবং ক্ষমতাবান ও শক্তিমানদের বেপরোয়া আচরণ লক্ষ্য করে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, মানুষের চেতনা থেকে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ কি উবে যাচ্ছে? যারা কায়েমি স্বার্থবাদী, প্রশ্ন তাদের নিয়ে নয়; যারা সব সময় নৈতিক চেতনাকে ধামাচাপা দেয়, যারা সাধারণ মানুষÑ যারা সংখ্যায় শতকরা আটানব্বই ভাগ, প্রশ্ন তাদের নিয়ে। এ সমাজের ভেতর থেকে কি বিবেকবান, চিন্তাশীল, সত্যসন্ধ ব্যক্তি আত্মপ্রকাশ করবেন না? সাধারণ মানুষের মধ্যে মহৎ মানবীয় গুণাবলির জাগরণ দেখা দেবে না।

রেনেসাঁসের সূচনা থেকে উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছয়শ বছরব্যাপী মানবজাতির যে বিকাশ, সাধারণভাবে তা ছিল প্রগতির ধারায়। ওই সময়টাই আধুনিক সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশের কাল। আধুনিক যুগের মর্মে নানা প্রবণতার মধ্যে প্রধান ছিল রেনেসাঁসের স্পিরিট যা এখন নিতান্ত ক্ষীণ। তবে আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে শিল্পবিপ্লবের ধারা নানা পর্যায় অতিক্রম করে আজও বহমান আছে। ক্রমাগত নতুন প্রযুক্তি সামনে আসছে, মানুষের জীবনধারায় প্রবেশ করছে। এরই ফলে বৈষয়িক সম্পদে মানবজাতি আজ এত সম্পন্ন।

উল্লেখ্য, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা এবং বিভিন্ন ভূভাগের প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো নতুন সভ্যতা আত্মস্থ করে মানবজাতির মূল ধারায় শামিল হতে পারেনি। প্রবল জাতিগুলো তাদের জাগিয়ে রাখছে। তারাও শামুকের মতো নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে রাখতে চাইছে। বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চিরকালের জন্য আদিবাসী করে রাখার নীতি গ্রহণ করে চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার রেড ইন্ডিয়ানদের এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ইতিহাস দেখলে তা বোঝা যায়। জাতিসংঘের ইউনেস্কোর আদিবাসী নীতি অবিলম্বে পরিবর্তন করা দরকার। বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করা যাবে না। সভ্যতার প্রয়োজনে বিকাশশীল মাতৃভাষাগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হবে। আদিবাসীদের মানবজাতির মূল ধারায় আসতে দিতে হবে। আদিবাসীদের উন্নতির জন্য তাদের চিন্তাচেতনার উন্নতি দরকারÑ নিজেদেরকে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে রাখার মনোভাব তাদের উন্নতির প্রধান অন্তরায়। যারা তাদের চিরকালের জন্য ‘আদিবাসী’ করে রাখতে চায়, তারা চায় না যে তাদের চিন্তাচেতনা উন্নত হোক।

রেনেসাঁসের কালে দেখা গেছে, মানুষের উপলব্ধিতে বর্তমান যতই সমস্যা-সংকুল হোক, মানুষ আশা করেছে উন্নতির ভবিষ্যৎ। এর মধ্যে প্রগতির পরিপন্থী ও হীন-স্বার্থান্বেষী কার্যক্রম দ্বারা প্রগতির ধারা বাধাগ্রস্ত হলেও থেমে যায়নিÑ সাময়িক ক্ষয়ক্ষতির পর বেগবান হয়েছে। প্রগতি সাধিত হয়েছে প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মোকাবিলার মধ্য দিয়ে। প্রতিক্রিয়ার শক্তি কায়েমি-স্বার্থবাদী ও প্রগতিবিরোধী। নতুন প্রযুক্তি বারবার আঘাত করেছে প্রচলিত বিধিব্যবস্থা ও জীবনযাত্রা প্রণালিকে। তাতে প্রতিক্রিয়ার শক্তি তৎপর হয়েছে। অনুন্নত নতুন প্রযুক্তির অভিঘাতে বাস্তবতা আজ এমন এক রূপ নিয়েছে যে, এখন গোটা পৃথিবীতেই আর কোনো প্রগতিশীল শক্তির সন্ধান পাওয়া যায় না। প্রগতিশীল বলে যারা আত্মপরিচয় দেন, তারা প্রগতিশীল নন। কেবল ধর্মের বিরোধিতা করার নৈতিক-বিবেচনাবর্জিত কথিত মুক্তবুদ্ধিচর্চার, আর উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করার মধ্যে তো প্রগতির কিছু থাকে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কথিত ধর্মপন্থিরা যত আক্রান্ত হচ্ছে, ততই বাড়ছে। গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের আদর্শগত ও সাংগঠনিক দুর্বলতাই এর মূল কারণ। লোকে কথিত গঠনতন্ত্রীদের ও কথিত সমাজতন্ত্রীদের কর্মকা-ে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছে না। লক্ষণীয়, ধর্মপন্থিদের কোনো কোনো অংশেও জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চর্চা আছে। মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সজ্ঞান-সচেতন-সক্রিয় পরিকল্পিত ভূমিকা আছে। মৌলবাদকে সামনে নিয়ে চলাকে তারা নিজেদের জন্য খুব সুবিধাজনক মনে করে।

রেনেসাঁসের কালে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও জাতি আত্মশান্তিতে বিশ্বাসী ছিল। মানুষ অপরিসীম শক্তি ও অন্তহীন সম্ভাবনার অধিকারীÑ এ বোধ তখন মানবজাতির মধ্য থেকে যেভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে বিশ্বযুদ্ধপর্বে এসে তা আর বাজায় থাকেনি। মানুষ তার ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তির বলে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা দ্বারা মানবীয় সব কিছুকে মনের মতো করে পুনর্গঠিত করে নিতে পারবে। পৃথিবীকে ঋদ্ধিমান ও সম্প্রীতিময় করে তুলবেÑ এ বিশ্বাস মানুষের মনে দৃঢ়মূল ছিল। একজনে না করলে বহুজনে মিলে পারবে, এক জেনারেশনে না পারলে জেনারেশনের পর জেনারেশনের চেষ্টায় পারবেÑ এ বিশ্বাস দৃঢ়মূল ছিল। সাধারণভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সার্থক, খারাপের চেয়ে ভালোটাকে মানুষ বড় করে দেখত। পরাজিত সার্থকতা ও নৈরাজ্যবাদ কম লোকের মধ্যে ছিল। শ্রমজীবী সাধারণ মানুষেরা তখন জাগ্রত ছিল এবং তাদেরও দেখা হতো অন্তহীন সম্ভাবনাময় সত্তারূপে। ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে ছিল বাস্তবভিত্তিক, বাস্তবায়নসম্ভব, অন্তহীন স্বপ্নকল্পনা। মানুষের সামনে বাস্তব জীবন, বাস্তব সমাজ, বাস্তব রাষ্ট্র ও বাস্তব পৃথিবীর ঊর্ধ্বে ছিল ভবিষ্যতের, অভিপ্রেত কল্পিত আদর্শ জীবন, কল্পিত আদর্শ সমাজ, কল্পিত আদর্শ রাষ্ট্র ও কল্পিত আদর্শ পৃথিবী। মহান লক্ষ্যে তখন মানুষ শঙ্খশক্তি গড়ে তুলতে পারত। ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও আদর্শ উপলব্ধির ও আদর্শ সামনে নিয়ে চলার সাধনা ও সংগ্রাম ছিল। এখন সে অবস্থা নেই। মনে হয় ইতিহাসের চাকা এখন পেছন দিকে ঘুরছে।

ফরাসি বিপ্লব থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ (১৭৮৯-১৯৯১) পর্যন্ত ২০০ বছর মানুষ ছিল পরিবর্তন-উন্মুখ, এখন মানুষ পরিবর্তন-বিমুখ। ধীরে ধীরে মানুষ অতীতমুখী হচ্ছে। জনমনে তখন উন্নত ভবিষ্যতের আশা ছিল, প্রগতির উপলব্ধি ছিল। সংকটের উপলব্ধি ও সংকট অতিক্রম করার আকাক্সক্ষাÑ কোনোটাই মানুষের মধ্যে এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। দুর্বল মানুষ চলছে প্রবলের জুলুম-জবরদস্তি মেনে নিয়ে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্বল মানুষ শক্তি অর্জনের কথা ভাবছে না। নেতৃত্ব আশা করছে, কিন্তু নেতৃত্ব সৃষ্টি করার দায়িত্ব গ্রহণে এগোচ্ছে না। মানুষ উদাসীন।

অত্যুন্নত নতুন প্রযুক্তির বিস্তার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয়ের পর মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ প্রতিযোগিতাবাদ, বহুত্ববাদ নিয়ে বিশ্বায়নের নামে যেসব কর্মকা- চালানো হচ্ছে, ধর্ম ও পুরনো সংখ্যার বিশ্বাসকে যেভাবে পুনরুজ্জীবিত করে তোলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ও লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে সামরিক আক্রমণ ও গণহত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করলে, কারণ-করণীয়-করণ ও ফলাফলের সূত্র ধরে গোটা ব্যাপারটিকে বুঝতে চেষ্টা করলে বোঝা যায় যে, ইতিহাসের চাকাকে পেছন দিকে ঘোরানো হচ্ছে এবং মানবজাতিকে এক দারুণ সভ্যতার সংকটে নিক্ষেপ করা হয়েছে।

রেনেসাঁসের বিকাশধারায় শিল্পবিপ্লবের অগ্রগতির একপর্যায়ে মার্কসবাদ আত্মপ্রকাশ করেছিল মানবজাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতিহার প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৮ সালে, একে একে রুশ বিপ্লব ও চীন বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৭ সালে ও ১৯৪৯ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয় ঘটেছে ১৯৯১ সালে। এখন শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বের তত্ত্ব আর আকর্ষণীয় নেই। গণতন্ত্রকে উদ্ধার গণতন্ত্র নাম দিয়ে যে রূপ দেওয়া হয়েছে তাকে গণতন্ত্র না বলে বলা উচিত ধনিক-বণিকদের নির্বাচনতন্ত্র। নির্বাচনকে তারা বলছে জনজীবনের উৎসব। হুজুগ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে তারা উৎসবে মাতাচ্ছে।

এসব কিছুই বলে দেয় যে, মানবজাতি আজ এক গভীর সংকটে নিপতিত। দুই বিশ্বযুদ্ধ পর্বেই সভ্যতার সংকটের গভীর উপলব্ধি ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকদের মহলে দেখা দিয়েছিল। ওই পর্যায়েই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’। অবশ্য মার্কসবাদ তখনো আশার আলো ছড়াচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তী অভিজ্ঞতা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয়ের পর সে আলো নিভে গেছে। ইউরোপ, এশিয়া, আমেরিকার বিভিন্ন জাতির ইতিহাস আলাদা আলাদাভাবে এবং গোটা মানবজাতির ইতিহাস একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করলে সভ্যতার সংকটের প্রকৃতি ও বিকাশধারা বোঝা যায়।

প্রচারমাধ্যমে এবং সাময়িকপত্রাদিতে এই সভ্যতার সংকটের সজ্ঞান, সচেতন উপলব্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। পৃথিবীর কোনো দেশের শাসকশ্রেণির বুদ্ধিজীবীরাই এই সংকট উপলব্ধি করেন না। তারা মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি, মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর মানবোন্নয়নের হিসাব নিয়েই সন্তুষ্ট। সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও সম্ভাবনা এবং সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কোনো দেশের শাসক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীরাই চিন্তা করেন না। অত্যুন্নত প্রযুক্তি নিয়ে সব দেশেই প্রচারমাধ্যমও এখন একান্তভাবে কেবল শাসকশ্রেণির সেবায়ই নিয়োজিত থাকছে। ফলে স্বাধীন চিন্তাশীলতা আত্মপ্রকাশের কোনো উপায় পাচ্ছে না। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয়ের পর এখন পর্যন্ত প্রগতিশীল কোনো শঙ্খশক্তিও পৃথিবীর কোনো দেশেই দেখা দেয়নি।

রেনেসাঁসের স্পিরিট থেকে বিচ্যুত হয়েই বিভিন্ন জাতি এবং গোটা মানবজাতি সভ্যতার সংকটে পড়েছে। দুই বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও পরবর্তী নৈতিক অসচেতনতা সংকটকে গভীর থেকে ক্রমাগত গভীরতর করেছে। কাউন্টার-রেনেসাঁস রূপে একে একে দেখা দিয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে আধুনিকতাবাদ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে উত্তরাধুনিকতাবাদ। লেখক মহলে এসবের মধ্য দিয়ে দেখা দিয়েছে নৈরাশ্যবাদ, কলাকৈবল্যবাদ, শূন্যবাদ, পদ্ধতিসর্বস্বতাবাদ এবং ক্লাসিকের প্রতি ও মানববাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি আদর্শের প্রতি বীতরাগ। অত্যুন্নত প্রযুক্তি ও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান নিয়ে আর সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রগতি, রেনেসাঁসের স্পিরিট ও নৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে মানবজাতি আজ কোন গন্তব্যের দিকে চলছে? অবশ্যই গভীর থেকে গভীরতর সংকটের দিকে। মানুষের জন্য কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি ও বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধিই কি সব?

রেনেসাঁসে ভালোর সঙ্গে মন্দও ছিলÑ ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষ ও তার সমাজ। মন্দবিহীন শুধুই ভালো কিছুই পাওয়া যায় না। রেনেসাঁসের ভাবপ্রকাশের বিকাশের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে দেখা দেয় উপনিবেশবাদ, ক্রুসেড ও সাম্রাজ্যবাদ। খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যেও দেখা গিয়েছে বিরোধ। উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম চলে। মানুষের সমাজে ভালো মন্দকে পরাজিত রাখবে এবং প্রগতির বাধা দূর করে এগিয়ে চলবেÑ এটাই ছিল কাম্য। রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে বিকশিত শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের লক্ষ্য ছিল পৃথিবীকেই স্বর্গে উন্নীত করা। রেনেসাঁস ছিল পশ্চিম-ইউরোপকেন্দ্রিক। ক্রমে তা ইউরোপে ও অন্যান্য মহাদেশে সব জাতির মধ্যে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্নœ নামে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা ভাষার দেশে উনিশ শতকের প্রথম পাদে রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) চিন্তা ও কর্মের মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল রেনেসাঁস। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত কালে আমাদের এখানেও জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে বহমান ছিল রেনেসাঁসের স্পিরিট। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সার্বিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে সে ধারা ক্ষীয়মাণ হয়ে পড়ে। তবে কিছু লোকের চেতনায় রেনেসাঁসের স্পিরিট বহমান আছে।

আগেকার রেনেসাঁসের লক্ষ্য ছিল মধ্যযুগের সংস্কার-বিশ্বাস, ভ্রান্তি ও অনাচার অতিক্রম করে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য অবলম্বন করে সভ্যতার ধারায় প্রগতির পথে এগিয়ে চলা ও উন্নততর নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করা। এখন নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের সংস্কার-বিশ্বাস, ভ্রান্তি ও অনাচার অতিক্রম করে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য অবলম্বন করে প্রগতির পথ ধরে নতুন সভ্যতার ধারায় এগিয়ে চলা। এই অগ্রযাত্রার অভাবেই মধ্যযুগের পরাজিত সংস্কার-বিশ্বাস ও ভাবধারা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছেÑ ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে। প্রত্যেক জাতির মধ্যে বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরই বিবেচনার কেন্দ্রীয় বিষয় আজ হওয়া উচিত রেনেসাঁস, ইতিহাসের পশ্চাৎগতি রোধ ও অভীষ্ট নতুন রেনেসাঁস।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : শিক্ষাবিদ

  

আপনার মন্তব্য লিখুন