আজ | শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯
Search

এশিয়ার নতুন সূর্য ভিয়েতনাম

শেষ পর্ব

লতিফুল হক মিয়া | ১:৫২ অপরাহ্ন, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

chahida-news-1505634725.jpg

এক সময়ে এই নামটাই অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বামপন্থী, মানবতাবাদী আন্দোলনকে। তোমার নাম, আমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম প্রবাসের অলিগলিও মুখরিত হয়েছিল এই ¯েøাগানে। সম্পূর্ণ অন্য কারণে দেশটি অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে এখন। অর্থনৈতিক উন্নতির নিরিখে। যে আমেরিকার বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর লড়াই করেছিল ভিয়েতনাম, সেই আমেরিকার সাহায্য নিয়েই অবশ্য।

সারা বিশ্বে চলছে আর্থিক মন্দা। বিদেশি বিনিয়োগ শ্লথ। সমস্যায় পড়েছে এশিয়া তথা বিশ্বের গ্রোথ ইঞ্জিন চীনও। এই অবস্থায় ব্যতিক্রম ভিয়েতনাম। প্রায় ১০ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ২০১৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। মাথাপিছু আয় ৩৩৫৪ মার্কিন ডলারের দেশটিতে ১০১৬ সালের প্রথমার্ধেই এসেছে ১১০৩ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ। আগের বছরের তুলনায় ১০৫% বৃদ্ধি। ১৯৯০ থেকে এখন পর্যন্ত ভিয়েতনামের গড় আর্থিক বৃদ্ধির পরিমাণ ৬%। চীনের পরেই। এমন বৃদ্ধির ধাক্কায় ভিয়েতনাম বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ থেকে এখন মধ্য আয়ের দেশ। আর এক দশক যদি ভিয়েতনামের বৃদ্ধির হার গড়ে ৭% হতে পারে তাহলে চীন এবং অন্যান্য এশিয়ান টাইগারদের সঙ্গে একাসনে চলে আসবে কমরেড হো চি মিনের দেশটি। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং চীনকে ছোয়ার লক্ষ্যেই নির্দিষ্ট নীতি নিয়ে চলেছে ভিয়েতনাম। তবে সমস্যাও আছে। এই আর্থিক নীতি যদি ব্যর্থ হয়, যদি জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার ৪ শতাংশে নেমে আসে তাহলে থাইল্যান্ড আর ব্রাজিলের মতো নিচে নেমে আসবে তারা।

ভিয়েতনামের সবচেয়ে সুবিধার জায়গা অবশ্যই তার ভৌগলিক অবস্থান। আরও পরিস্কার করে বললে চীনের দক্ষিণে বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চল এবং তাইওয়ানের সঙ্গে তার নৈকট্য। সমুদ্র এবং সড়কপথে যোগাযোগ। চীনে যখন মজুরি বাড়ছে তখন ভিয়েতনামে কারখানা করা বেশ সুবিধার। ভিয়েতনামের যুবা জনসংখ্যাও চীনের তুলনায় বেশি। ভারতের মতো গ্রামে থাকেন প্রায় ৭০% বাসিন্দা। ফলে সহজেই শহরে মেলে গ্রাম থেকে আসা শ্রমিক। আর এই জনতাকে আধুনিক শিল্পের উপযোগী করার জন্য উপযুক্ত নীতিও নিয়ে চলেছেন হো চি মিন সিটির কর্তাব্যক্তিরা। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য বলছে, শিক্ষার পেছনে ভিয়েতনামের খরচ ২০০৮ সালে জি ডি পির ৫.৩% থেকে বেড়ে এখন হয়েছে ৬.৩%। অন্যদিকে ভারত ১৯৯৯ সালে যেখানে শিক্ষায় খরচ করত জি ডি পির ৪.৩%, সেখানে ২০১১ সালে তা কমে হয়েছে ৩.৭%। সেদিক থেকে দেখলে শিক্ষার পেছনে ভিয়েতনামের খরচ অন্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় গড়ে ২ শতাংশ বিন্দু বেশি। আর এই অর্থ বেশ পরিকল্পনা করে খরচও করে তারা। ভিয়েতনামের মূল নজর যাতে বেশি সংখ্যক ছাত্র স্কুলে আসে, স্কুলছুটের সংখ্যা কমে এবং গড় নূন্যতম বিদ্যাশিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায়। এই নীতির ফলে ভিয়েতনামের ছাত্ররা অঙ্ক এবং বিজ্ঞানে আমেরিকার এবং ব্রিটেনের ছাত্রদের তুলনায় এগিয়ে। তার ফল আবার ফলছে ভবিষ্যতে জটিল মেশিনে কাজ করার উপযুক্ত হয়ে ওঠায়। এছাড়া ১৯৯০ থেকেই মুক্ত বাণিজ্য নীতি নিয়ে চলেছে তারা। দেশের ৬৩টি প্রদেশ বিদেশি বিনিয়োগ টানতে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। ১৯৯১ সালে হো চি মিন সিটিতে আমেরিকা ও চীনের সাহায্যে যে শিল্প পার্ক গড়ে উঠেছিল, পরে তা গড়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এইসব কারণেই ভিয়েতনামকে এশিয়ার আগামী বাঘ বলে উল্লেখ করেছে দি ইকোনমিস্ট পত্রিকা।

তবে সমস্যাও আছে। ২০১১ সালে নির্মাণশিল্পের বুদবুদ ফেটে যাওয়ার পরে ভিয়েতনামের ব্যাঙ্কগুলি সমস্যায় পড়েছে। সেদেশের বেসরকারি ক্ষেত্রেও যথেষ্ট উদ্যোগী নয়। মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডে যেখানে গড়ে ৬০% বেসরকারি সংস্থা রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত সেখানে ভিয়েতনামে সংখ্যাটা মাত্র ৩৬%। সামসুং ভিয়েতনামে মোবাইল তৈরির কারখানা করবে বলে পরিকল্পনা করেছে। সেখানকার দেশীয় সংস্থাগুলি কী কী সরবরাহ করতে পারে তার খোঁজ নিতে গিয়ে সামসুং দেখেছে, শুধুমাত্র প্লাস্টিকের মোড়ক ছাড়া আর কিছুই মিলবে না স্থানীয় বাজার থেকে। আর সবই আমদানি করতে হবে। অবস্থার উন্নতি করার চেষ্টা করছে ভিয়েতনাম। সফল হলে আগামীতে এশিয়ার আরেক নতুন সূর্যের উদয় হবে।

আয়নায় যুক্তরাষ্ট্র-ভিয়েতনাম সম্পর্ক: যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৩ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে। এমনকি দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রতি তার সামরিক সমর্থনও প্রত্যাহার করে নেয়। আর দক্ষিণের মানুষ তখন মনোবলহীন হয়ে পড়ে। উত্তর ভিয়েতনাম ২০ বছর যুদ্ধের পর তাদের মাতৃভ‚মিকে একীভ‚ত করে। উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম চলে যায় সাম্যবাদী শাসনে।

দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গনের পতন হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র হেলিকপ্টারে করে তাদের সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার শুরু করে। যা যুদ্ধের ইতিহাসে একটা বড় ঘটনা। সায়গনের নতুন নাম দেয়া হয়- হো চি মিন সিটি। ভিয়েতনাম বিপ্লবের নেতার নামে এই নামকরণ। ভিয়েতনামেরও নতুন নাম দেয়া হয়। দ্য সোস্যালিস্ট রিপাবলিক অব ভিয়েত নাম (ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র)। এর পরের বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে আদর্শিক মতবিরোধ শুরু হয়। শুরু হয় দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অবন্ধুসুলভ সম্পর্ক। দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ।

আজকের ভিয়েতনামের চেহারা একেবারে ভিন্ন। কিছু বিশ্লেষক ভিয়েতনামকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জার্মানি বলে উল্লেখ করেন। দেশটির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাহিনী আর রফতানি মুখি অর্থনীতি ভিয়েতনামের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলে। অর্থনীতির এই উন্নতি পুরাতন শত্রæকে বন্ধু করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার শেষ প্রান্তে জাপান যান। তার আগে তিনি ভিয়েতনাম সফরে যান। ভিয়েতনামের নেতা নগুয়েন ফু ট্রঙ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এক বছর আগে। কিন্তু যুদ্ধোত্তরকালে এমন দৃশ্য ছিলো কল্পনাতীত। ভিয়েতনাম কর্তৃপক্ষ তখন নাগরিকদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং সাম্যবাদী আদর্শে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়। পরাজিত দক্ষিণ ভিয়েতনামের আমলা, শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারিদের ভিয়েতনামের নয়া ইতিহাস পাঠ করতে বলা হয়। সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের যেতে হয় পুনর্পাঠ কেন্দ্রে। শত শত মানুষকে এই কেন্দ্রে থাকতে হয় কয়েক বছর। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের জনগণের একটা বড় অংশে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তারা নৌকায় করে পালিয়ে যেতে থাকে। পলিয়ে যাওয়া দক্ষিণ ভিয়েতনামীদের সংখ্যা ছিলো কমপক্ষে সাড়ে ৭ লাখ। পলায়ন বাড়ে খাদ্য সংকটের কালে। মেকং বদ্বীপ কৃষির উর্বর ভ‚মি। কিন্তু হতাশ কৃষকরা উৎপাদন করেনি নতুন শাসনের অধীনে। এমন পরিস্থিতিতেও ভিয়েতনামের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিলো উচ্চাকাঙ্খী। ওই পরিকল্পনায় আশা করা হচ্ছিলো জাতীয় আয় বাড়বে ১৪ শতাংশ। পরিকল্পনা কাজ করেনি। ১৯৭৯ সালের দিকে সরকার নিয়ন্ত্রিত খাদ্য সরবরাহ শুরু করে। নাগরিকরা মাসে ২ কেজি চাল ও ২০০ গ্রাম মাংস পেতো বলেও প্রচার ছিলো তখন।

১৯৭৮-৭৯ সালের কথা। কম্বোডিয়ায় তখন চীন সমর্থিত খেমার রুজ সরকার। ভিয়েতনাম খেমারদের উৎখাত করে। বিশাল প্রতিবেশি চীনের সঙ্গে শুরু হয় নতুন উত্তেজনা। চীনা নেতা দেং শিয়াও পিং প্রতিজ্ঞা করেন ভিয়েতনামকে উচিৎ শিক্ষা দেবেন। এক মাসের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়। চীন বলে শিক্ষা দেয়া হয়েছে ভিয়েতনামকে। ভিয়েতনামীরাও বিজয় দাবি করে। বলে, তারা তাদের উত্তরের বিশাল প্রতিবেশিকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। অন্য কথায় বলতে গেলে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের তিক্ত সম্পর্ক ভিয়েতনামকে সুবিধা দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ভিয়েতনামের মিত্র।

চীনের সঙ্গে উত্তেজনার সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি অংশ নেয়নি। তবে ভিয়েতনাম মূল মিত্র হিসেবে থেকে যায়। এমনকি যৌথ মহাশুণ্য কর্মসূচিও গ্রহণ করে। এই কর্মসূচির আওতায় ভিয়েতনাম বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা ১৯৮০ সালে নভোযানে আকাশ ভ্রমণ করেন। তিনিই হন প্রথম এশীয়, যিনি মহাকাশ ভ্রমণ করেন।

এই বিমান সেনা যখন মহাকাশ পরিভ্রমণ করেন তখন থেকে ভিয়েতনামের অর্থনীতির চাকাও সামনে এগুতে শুরু করে।

গত শতকের আশির দশকের মধ্যভাগে নেয়া হয় সংস্কার কর্মসূচি। সরকার নিয়ন্ত্রিত এই কর্মসূচির নাম দেয়া হয় সমাজতন্ত্র ভিত্তিক বাজার অর্থনীতি। এই কর্মসূচি অনেকটা চীনের কর্মসূচির আদলে গড়া। নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৭০ শতাংশ রফতানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়।

এর পর শুরু হয় ভিয়েতনামের নবযাত্রা। ভিয়েতনাম এখন এশিয়ার সফল দেশের একটি। ১৯৮৬ সালে গড় আয় ছিলো মাথাপিছু ১০০ ডলার। এখন তা ৩৩৫৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলে তা আরো বেশি। ১৯৯১ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। নতুন রোডম্যাপ প্রণয়ন করে। ১৯৯৪ সাল থেকে মার্কিন বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো ভিয়েতনামে যেতে পারছে। ১৯৯৫ সালে হ্যানয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন দূতাবাস খুলেছে। উভয় পক্ষই এখন যুদ্ধের স্মৃতি ভুলতে চায়।

বর্তমানে ভিয়েতনামের মুল উদ্বেগের বিষয় হলো দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি। ভিয়েতনাম এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমরাস্ত্র কিনতে চায়। কিন্তু বহু বছর আগে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ভিয়েতনামের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রি করতে পারে না যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বলছে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত। ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী নগুয়েন তান ডঙ হয়তো সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখার কিছু উপায়ও আছে ভিয়েতনামের হাতে। বারাক ওবামা চেয়েছিলেন ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকুক। যার মাধ্যমে চীনকে মোকাবেলা করা সহজ হবে। প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের সামরিক শক্তি স¤প্রসারণ মোকাবেলায় ওবামা ভিয়েতনামকে পাশে পেতে চেয়েছিল।

বারাক ওবামার ক্ষমার শেষ প্রান্তের ভিয়েতনাম সফর ইঙ্গিতবহ। এটা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিয়েতনামকে এই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সুচনা করতে চায়। তবে এটা একটা বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। চীনের সামরিক স¤প্রসারণে সন্ত্রস্ত যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে যেমন সুসম্পর্ক চায়, তেমনি ভিয়েতনামের সঙ্গেও পুরনো শত্রæতা মিটিয়ে ফেলতে চায়। আর চাওয়াটা বোধ করি দুদেশের জন্যই জরুরি। জরুরি কৌশলগত কারণে, অর্থনৈতিক কারণে। সিএনএন।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

  

আপনার মন্তব্য লিখুন